ইসলাম ও ইসলামের পরিচয় । মুসলিম কারা ? । আমাদের কিছু ভুল ধারণা

ইসলাম কী?

ইসলাম বলতে আমরা কতটুকু বুঝি। ইসলাম মানে কি কুরবানী দিয়ে গোস্ত খাওয়া। ইসলাম মানে কি শুধু দান-সদকা করা। ইসলাম মানে কি শুধু মসজিদে যাওয়া আসা করা। নাকি মুসলিম পরিবারে জন্ম নিলে আমার ইসলামের সব কাজ করা শেষ। নাকি আমাদের আরও অনেক দায়িত্ব রয়েছে। মূলত ইসলাম কী? সে সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে বলব। তাই অনুগ্রহ করে পড়তে থাকুন।

ইসলামের সহজ পরিচয়

ইসলামের সহজ পরিচয়

সাধারণ মুসলিম জনগণ ইসলামকে শুধু একটা ধর্ম হিসেবে জানে। যারা নিয়মিত নামাজ-রোজা করে তাদের মধ্যে অনেকে বাস্তব জীবনে ইসলামের কোন প্রভাব থাকতে পারে, এমন ধারণা রাখে না।জনগণ আলেম সমাজ থেকে ইসলামের যে আলো পেয়েছে এবং তারা দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে তাদেরকে যেটুকু ধারণা দিয়েছেন ঠিক ততটুকুই তারা জানেন। এর চেয়ে বেশি জানেনা।

মানুষের জীবনে বহু দিক রয়েছে- ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সংস্কৃতিক ইত্যাদি। কিন্তু সাধারণভাবে এসব দিক থেকে ধরমীয় দিককে আলাদা মনে করা হয়।

অন্যান্য ধর্মে অবশ্য ওই সব দিক থেকে ধর্ম আলাদাই। কিন্তু ইসলামে ধর্মীয় দিকটি অন্যান্য দিক থেকে আলাদা নয়। বরং সকল দিকের ওপরই ধর্মীয় দিকের এমন ব্যাপক প্রভাব রয়েছে যে, মনে হয় সকল দিকই ধর্মীয় দিকের অধীনে রয়েছে।

ইসলামের দৃষ্টিতে এই ধর্মীয় দিকটি গোটা মানব জীবনের চালিকাশক্তি। আল্লাহ তা’আলার দাসত্ব এবং আল্লাহর রাসূল সাঃ এর আনুগত্য ও আখেরাতের জবাবদিহিতা- এ তিনটি ধর্মীয় নীতি মুসলমানদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। মুমিনের জীবনে দীনদারী ও দুনিয়াদারিতে কোন তফাৎ নেই। ওই তিনটি ধর্মীয় নীতি অনুযায়ী কাজ করলে দুনিয়াদারি বলে গণ্য সকল কাজ ও দ্বীনদারী তে পরিণত হয়।

দ্বীনদারী বনাম দুনিয়াদারি

দ্বীনদারী বনাম দুনিয়াদারি

এক হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এশার নামাজ জামাতের সাথে আদায় করার পর ঘুমিয়ে গেলে, সে যদি ফজর নামাজ জামাতের সাথে আদায় করে তাহলে তার সে ঘুমটা ইবাদাত হিসেবে গণ্য হবে। আল্লাহর দেওয়া নিয়মে ঘুমালে ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়।

এভাবে আল্লাহর দেওয়া নিয়মে বিয়ে-শাদি, ঘর-সংসার, রুজি-রোজগার, চাষাবাদ, ব্যবসা-বাণিজ্য, খাওয়া-দাওয়া, এমনকি পেশাব পায়খানা করাটাও ইবাদতের মধ্যে গণ্য। তাই খাঁটি মুমিনের পার্থিব জীবনের সব কাজকর্ম দ্বীনদারী।

সুতরাং, দ্বীন ইসলাম অন্যান্য ধর্মের মত শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এর নাম নয়। হিন্দুরা পূজা-উপাসনা উপবাসের মাধ্যমে ধর্ম পালন করে। খ্রিস্টানরা প্রতি রবিবার গির্জায় গিয়ে উপাসনা করে।

এসব পূজা-উপাসনার সাথে দুনিয়ার অন্য সব কাজের কোনো সম্পর্ক নেই। ইসলাম এ জাতীয় কোন ধর্ম নয়। ইসলামের ধর্মীয় কাজ গুলোর মাধ্যমে জীবন যাপনের শিক্ষা দেওয়া হয়। মুসলমানদের ধর্মীয় জীবন কখনো দুনিয়ার জীবন থেকে আলাদা নয়।

মুসলিম কারা

মুসলিম পরিবারে জন্ম নিলেই কি মুসলিম হওয়া যায়?

আমরা মনে করি মুসলিম পরিবারে জন্ম নিলেই মুসলিম হওয়া যায়। আমরা আমাদের নিজেদেরকে একজন মুসলিম হিসেবে দাবি করি। আসলেই কি মুসলিম পরিবারে জন্ম নিলে মুসলমান হওয়া যায়। এটা কতটুকু সত্য।

ইসলামের চমৎকার পরিচয়টা আমাদের সমাজের খুব কম লোকেরই জানা আছে। যারা নিজেদেরকে মুসলমান মনে করে, তাদের সবার ইসলামের পরিচয় জানা খুবই জরুরী। ইসলামকে এভাবে না জানলে কেমন করে খাঁটি মুসলমান হওয়া যাবে?

আর খাঁটি মুসলমান হতে না পারলে দুনিয়ায় শান্তি ও আখেরাতের শাস্তি থেকে নাজাত পাওয়ার কোন উপায় থাকবেনা। তাই খাঁটি মুসলমান হওয়ার জন্য আমাদেরকে জানতে হবে যে, কিভাবে খাঁটি মুসলমান হওয়া যায়।

লোকেরা মনে করে যে মুসলিম পরিবারে জন্ম নিলেই মুসলমান হওয়া যায়। এ ধারণা একেবারেই ভুল। মুসলমানের সন্তান কাফির হয়ে যেতে পারে। আবার কাফিরের সন্তান খাঁটি মুসলমান হতে পারে। অনেক কাফিরের সন্তান খাঁটি মুসলমান হয়েছে।

অনেক হিন্দু , বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান এবং অন্যান্য ধর্মের লোকেরা অমুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও খাঁটি মুসলমান হয়েছে। আবার খাঁটি মুসলমান ঘরের সন্তান হয়েও কাফের বা অমুসলিম হয়ে গেছে।

জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিতা ছিলেন একজন কাফের। অথচ ইব্রাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন একজন খাঁটি মুসলিম। সুতরাং বলা যায় কাফের হলেই সন্তান কাফির হবে এমনটা মোটেও ঠিক নয়। আবার হযরত নূহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন একজন খাটি মুসলিম।

অথচ তার ছেলে ছিলেন একজন কাফের। জন্মগতভাবে কেউ মুমিনরা কাফের হয় না। মুমিন হওয়ার জন্য প্রথম শর্ত হলো ঈমান। ঈমান আনা ও না আনার ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা মানুষকে স্বাধীনতা দিয়েছেন। বিশ্বাস মনের ব্যাপার। মনের উপরে কখনো জোর খাটে না।

তাই ঈমান আনার জন্য জোর করতে আল্লাহ তাআলা নিষেধ করেছেন। যখন মানুষের জ্ঞান বুদ্ধি কাজে লাগানোর বয়স হয় তখন নিজের ইচ্ছায় কাফিরা সন্তান ও ঈমানদার হয়ে যেতে পারে, আবার মুমিনের সন্তান কাফির হয়ে যেতে পারে, মুসলিম হওয়ার জন্য বেশ কিছু জরুরী গুণের প্রয়োজন।

সর্বপ্রথম তাকে তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাতে বিশ্বাসী হতে হবে। এরপর তাকে মুসলিম হিসেবে জীবন যাপনের উদ্দেশ্যে কুরআন ও হাদিসের কিছু ইলেম হাসিল করতে হবে এবং সে অনুযায়ী মুসলিম চরিত্র গঠন করার মত আমল করতে হবে.

কাফের কোন সন্তান যদি ঈমান, ও আমলের কারণে মুসলিম হয়, তাহলে কোন মুসলিম সন্তানের মধ্যে এসব গুণ না থাকলে তাকে কি কারণে আল্লাহ মুসলিম হিসেবে গণ্য করবেন?

যেমন একটা উদাহরণ আমরা দেখে নেয়, সেটা হল:

একজন ডাক্তারের সন্তান যদি ডাক্তারিবিদ্যা না সেখে, তাহলে ডাক্তারের সন্তান বলে কি তাকে কেউ ডাক্তার বলে স্বীকার করবে? আবার একজন পাইলটের ছেলে যদি পাইলট হওয়ার জন্য যা যা শিক্ষা প্রয়োজন সেই সব শিক্ষা যদি গ্রহণ না করে তাহলেও কি ওই পাইলটের ছেলেকে পাইলট বলা যাবে? অবশ্যই বলা যাবে না।

কারণ, ডাক্তারের ছেলে হোক অথবা শিক্ষকের ছেলে হোক অথবা কোন ইঞ্জিনিয়ারের ছেলে হোক ছেলে হলেই সে কখনো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা শিক্ষক হবে না।

শিক্ষক হওয়ার জন্য যা যা প্রয়োজন সেগুলো অর্জন করলেই কেবল তাকে শিক্ষক বলা যাবে। আবার ডাক্তার হওয়ার জন্য যে জ্ঞানগুলো অর্জন করা প্রয়োজন, সেই জ্ঞানগুলো কেবল অর্জন করলেই তাকে প্রকৃত ডাক্তার বলা যাবে। নতুবা তাকে গ্রাম্য ভাষায় হাতুড়ে ডাক্তার বলা যেতে পারে। আবার ইঞ্জিনিয়ারের ছেলে হলেই তাকে আমরা ইঞ্জিনিয়ার বলবো না।

তাহলে বুঝা গেল মুসলিম পরিবারে জন্ম নিলেই মুসলমান হওয়া যায়না । কারন, মুসলিম হওয়ার জন্য যে গুণগুলো থাকা প্রয়োজন সেই গুন গুলো অর্জন করলেই তাকে মুসলমান বলা যাবে।

Click to rate this post!
[Total: 1 Average: 4]

Leave a Comment